আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ
🏛️ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ
🔹 আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব:
আধুনিক রাষ্ট্র এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন যেখানে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা, স্থায়ী জনসংখ্যা, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব থাকে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য হলো কেন্দ্রীয় শাসন, আইনপ্রণয়ন ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কাঠামো।
উদ্ভবের মূল পর্যায়:
-
ফিউডাল ব্যবস্থার পতন:
মধ্যযুগে ইউরোপে ফিউডাল ব্যবস্থার প্রচলন ছিল, যেখানে শক্তিশালী সামন্তরা ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ করত। সময়ের সাথে সাথে রাজারা কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা জন্ম নেয়। -
পুনর্জাগরণ ও প্রগতিশীল চিন্তাধারা:
১৪শ থেকে ১৬শ শতকে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর চিন্তার উন্মেষ ঘটে, যা আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। -
জাতিরাষ্ট্রের আবির্ভাব:
ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ভিত্তিতে এক জাতি এক রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা শুরু হয়। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেন ইত্যাদি দেশ জাতিরাষ্ট্রে রূপ নেয়। -
সার্বভৌমত্বের ধারণা:
জাঁ বোদাঁ এবং থমাস হবস সার্বভৌম রাষ্ট্র ধারণা দেন, যেখানে রাষ্ট্রই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব।
🔹 গণতন্ত্রের উদ্ভব:
গণতন্ত্র এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে জনগণ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শাসনের ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
মূল ধাপগুলো:
-
প্রাচীন গণতন্ত্র:
প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স শহরে (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক) সরাসরি গণতন্ত্র চালু ছিল। সকল পুরুষ নাগরিক সমানভাবে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। -
রোমান প্রজাতন্ত্র:
রোমে প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনের সূচনা ঘটে। সিনেট, কনসাল প্রভৃতি শাসনগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। -
ম্যাগনা কার্টা (১২১৫):
ইংল্যান্ডে এই দলিল রাজা ও প্রজার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনে। এটি গণতান্ত্রিক শাসনের প্রাথমিক ভিত্তি। -
আধুনিক গণতন্ত্রের সূচনা:
– ইংলিশ বিপ্লব (১৬৮৮): সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সূচনা।
– আমেরিকান স্বাধীনতা (১৭৭৬): ব্যক্তি স্বাধীনতা ও প্রতিনিধি গণতন্ত্রের ধারণা প্রতিষ্ঠা।
– ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯): “স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব” – গণতন্ত্রের মূল আদর্শ প্রতিষ্ঠা।
🔹 গণতন্ত্রের বিকাশ:
-
সংবিধান প্রণয়ন:
বিভিন্ন দেশে জনগণের অধিকারের সুরক্ষা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। -
সার্বজনীন ভোটাধিকার:
শুরুতে কেবল পুরুষ, তারপর নারী, এবং পরে সব শ্রেণির মানুষকে ভোটাধিকারের মাধ্যমে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। -
বহুদলীয় রাজনীতি ও নির্বাচন:
রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ শাসক নির্বাচন করে। এতে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। -
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা:
স্বাধীন মিডিয়া, এনজিও ও সামাজিক আন্দোলন গণতন্ত্রকে আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে।
🔚 উপসংহার:
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের বিকাশ একটি দীর্ঘ ও সংগ্রামী প্রক্রিয়া। বহু যুদ্ধ, বিপ্লব ও চিন্তাবিদের অবদানের ফলে আজকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য ন্যায়বিচার, সমতা ও স্বচ্ছতার চর্চা প্রয়োজন।

কোন মন্তব্য নেই